দেশে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটে পড়েছে। বর্তমানে আয়ের সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামের কোনো সামঞ্জস্য নেই। চাল, ডাল, সবজি ও মাছ-মাংসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর মধ্যে রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি এলপিজি এবং খাদ্য তালিকার অপরিহার্য পণ্য সয়াবিন তেলের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ভোক্তাদের জিম্মি করার অপচেষ্টা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই সংকটের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর নতুন করে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে হঠাৎ করেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দামের মধ্যে বাজারে এলপিজি গ্যাস ও সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আসল উদ্দেশ্য সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা। এমন অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজ। একই সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নীরবতা ও দৃশ্যমান তৎপরতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
অতি সম্প্রতি সংগঠনটির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলেন। বিবৃতিতে বলা হয়, দেশে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটে পড়েছে। বর্তমানে আয়ের সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামের কোনো সামঞ্জস্য নেই। চাল, ডাল, সবজি ও মাছ-মাংসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর মধ্যে রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি এলপিজি এবং খাদ্যতালিকার অপরিহার্য পণ্য সয়াবিন তেলের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ভোক্তাদের জিম্মি করার অপচেষ্টা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সংগঠনটি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, শুধু বাজার পরিদর্শন, নামমাত্র জরিমানা কিংবা সাময়িক অভিযান পরিচালনা করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না, বরং সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে প্রকৃতপক্ষে সরবরাহ সংকট থাকলে তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে তারা। বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, এলপিজি ও সয়াবিন তেলের বর্তমান সংকটের প্রকৃত কারণ তদন্ত করে প্রকাশ করা, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বাজার তদারকি জোরদার করা।
সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার কোনোভাবেই সিন্ডিকেট বা অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি থাকতে পারে না, জনগণের স্বার্থে বাজার নিয়ন্ত্রণে এনে ভোক্তার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
মন্ত্রণালয়ে তিন দফা বৈঠকের ফল ‘শূন্য’ : কয়েক সপ্তাহ ধরে ১২ কেজি ওজনের এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। দফায় দফায় বৈঠক করেও সরকার কারসাজিতে হস্তক্ষেপ করতে পারেনি।
এদিকে গত শনিবার ছুটির দিনেও নিজ কার্যালয়ে কয়েকটি এলপি গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বেঠক থেকে যেসব বিষয় পেয়েছি, তা আরো যাচাই-বাছাই করতে হবে। বেঠকে ওমেরা এলপিজির চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, একই কোম্পানির তানজিম চৌধুরী, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, যমুনা এলপিজির বেলায়েত হোসেন, আইগ্যাসের সিএফও হারুণ, বিএম এনার্জির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান, এসএইচভির সিইও মার্কো এন্টোনিওকে আমন্ত্রণ জানান হয়েছিল।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার এলপিজি নিয়ে সব জেলার ডিসিদের সঙ্গে জুম বৈঠক করেন মন্ত্রী। সেখানে বাজার কারসাজি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন তিনি। এরও আগে গত সোমবার এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে আরেকটি বৈঠক করেছিলেন জ্বালানিমন্ত্রী। সেই বৈঠকের কোনো ফলাফল এখনো আসেনি।
গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এলপিজির যে দাম নির্ধারণ করে, তাতে ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। আর বর্তমানে বাজারে এই গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ ১২ কেজি সিলিন্ডারে প্রায় ১ হাজার টাকা বেশি খরচ করছেন ভোক্তা। সরকার প্রতি কেজি এলপি গ্যাসের দাম ১৩২ টাকা ১২ পয়সা নির্ধারণ করলেও ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ২০৮ টাকা করে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, এলপিজি প্ল্যান্ট থেকে কোম্পানিগুলো খুবই কম পরিমাণে পণ্য বাজারে ছাড়ছে। ফলে ডিলার ও পরিবেশক পর্যায়ে পণ্য সংকটের কথা বলে বেশি দাম রাখা হচ্ছে। এলপিজি প্ল্যান্টগুলোতে গাড়িগুলো প্রায় ছয়-সাত দিন অপেক্ষায় থাকছে। এসব কারণে দাম বেড়ে গেছে। তবে এলপিজি অপারেটর বা কোম্পানিগুলো সরকারের কাছে এসব অভিযোগ অস্বীকার করছেন। গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ রয়েছে বলে দাবি করছেন তারা।
দেশে এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৮ লাখ টন হিসাব করা হয়। সেই হিসাবে প্রতি মাসে চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার টন। গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপি গ্যাস আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসেও প্রায় সমান পরিমাণ গ্যাস আমদানি হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ লোয়াবের সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, এলপি গ্যাসের পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে এটাও সত্য, আবার বাজারে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে সেটাও সত্য। এখন সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থার দায়িত্ব হচ্ছে প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা।
সরকারি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিতে অভিযান : সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন স্থানে বিশেষ তদারকি কার্যক্রম চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ঢাকা মহানগরসহ দেশের ১৬ জেলায় চালানো অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
গত শনিবার অধিদপ্তরের ২৩টি টিম ডিলার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় অভিযান চালায়। অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, গ্যাস সিলিন্ডারের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় ঠেকাতে এ তদারকি চালানো হয়। অভিযানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও প্রদান, সিলিন্ডারের নিরাপত্তাবিধি প্রতিপালন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হয়।
ভোক্তাদের গ্যাস সিলিন্ডার কেনার আগে ওজন, সিল, মেয়াদ ও দৃশ্যমান ত্রুটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছে অধিদপ্তর। পাশাপাশি মূল্যতালিকা যাচাই এবং ক্রয়ের সময় রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রিতে কোনো অনিয়ম দেখা গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানাতে পারবেন ভোক্তারা। অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে শৃঙ্খলা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান চলবে।
বিআলো/অর্নব